
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শত শত শিক্ষার্থীর মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে অবশেষে অবসরজনিত বিদায় নিলেন ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দরগাপাড়া মাজার শরীফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্পনা সাহা।
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক আবেগঘন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা জানানো হয়।
১৯৯৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৩১টি বছর। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম গড়ে তোলার এক নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবক। প্রিয় শিক্ষকের বিদায়লগ্নে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নামে অশ্রুসজল আবহ। সহকর্মী, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি।
অনুষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌসের স্বাগত বক্তব্যের পর বিদায়ী প্রধান শিক্ষকের কর্ম ও স্মৃতিচারণ করে মানপত্র পাঠ করেন সহকারী শিক্ষক সুরাইয়া নাসরিন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর শরীফুল্লাহ মুক্তি বলেন, “একজন শিক্ষক কখনো অবসরে যান না, তিনি আজীবন বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীদের মাঝে। কল্পনা সাহা শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার এক আলোকবর্তিকা। দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আমাদের শিক্ষক সমাজের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।”
নিজতুলন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম তালুকদার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী চাকরিজীবনের ইতি টানতে হলেও মানুষের হৃদয়ে যে আসন কল্পনা দিদি গড়ে তুলেছেন, তা কখনো মুছে যাবে না। বিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণা আর প্রাঙ্গণ আজ তার শূন্যতা অনুভব করছে। সততা ও আন্তরিকতার সাথে এত দীর্ঘ পথচলা সত্যিই বিরল।”
সভাপতির বক্তব্যে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম মোসলেম উদ্দিন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “বিদায় শব্দটা সবসময়ই কষ্টের। দীর্ঘ তিন দশকের একটি সম্পর্কের সমাপ্তি মানসিকভাবে মেনে নেয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের জন্যই কঠিন। কল্পনা সাহা নিজের সর্বস্ব দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটিকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকের শূন্যতা পূরণ করা সহজ নয়। আমরা তার সুস্থ, দীর্ঘ ও সুন্দর অবসর জীবন কামনা করি।”
তারাটি নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুল হুদার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হযরত আলী, সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার পারভেজ তাসাদ্দাক পিন্টু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবাদুল ইসলাম, উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি সিরাজ উদ্দিন, মল্লিকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আজহারুল ইসলাম, মাকরঝাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বন্দনা রানী পাল, কোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক, জাটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আক্কাস আলী, দরগাপাড়া মাজার শরীফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জিয়াউর রহমান, বড়জোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মুখলেছুর রহমান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী আসপিয়া জান্নাত ও রুবেল মিয়া প্রমুখ।
বক্তারা সকলেই কল্পনা সাহার কর্মময় জীবনের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তার অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। অনুষ্ঠান শেষে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অতিথিবৃন্দের পক্ষ থেকে বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
বিদায়ী প্রধান শিক্ষক কল্পনা সাহা তার বক্তব্যে বলেন, আজকের এই বিদায়লগ্নে দাঁড়িয়ে কথা বলা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন। ১৯৯৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই দরগাপাড়া মাজার শরীফ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। চোখের পলকে প্রায় ৩১টি বছর কীভাবে কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। এই দীর্ঘ সময়ে বিদ্যালয়টি কেবল আমার কর্মক্ষেত্র ছিল না, হয়ে উঠেছিল আমার পরিবার। ক্লাসরুম, বারান্দা আর খেলার মাঠের প্রতিটি ধূলিকণায় আমার হৃদয় জড়িয়ে আছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্নেহ আর সহকর্মীদের ভালোবাসাই ছিল আমার পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি। দায়িত্ব পালনকালে কাউকে অনিচ্ছাকৃত কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমা করবেন।
তিনি আরো বলেন, চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও আপনাদের প্রতি আমার ভালোবাসা চিরকাল অম্লান থাকবে। আমাদের প্রাণের এই বিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীরা অনেক দূর এগিয়ে যাক, এই প্রার্থনাই করি। জীবনের বাকি দিনগুলো যেন সুস্থ ও শান্তিতে কাটাতে পারি, সবাই আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন। সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
Leave a Reply