
বর্ষা আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। দিগন্তজোড়া অথৈ জলরাশি, নীল আকাশের প্রতিবিম্ব আর জলের বুকে ভেসে থাকা ছোট ছোট গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। বর্ষার এই মনোমুগ্ধকর রূপ দেখতে প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো ভ্রমণ পিপাসু ছুটে আসছেন নিকলী, মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামের হাওরাঞ্চলে।
বর্ষাকালে কিশোরগঞ্জের হাওর যেন এক বিশাল সমুদ্রে রূপ নেয়। জল আর আকাশের মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় এক অনন্য দৃশ্য, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বিশেষ করে নিকলীর ছাতিরচরের সোয়াম্প ফরেস্টে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা হিজল ও করচ গাছের সারি অনেকের কাছেই সিলেটের রাতারগুল জলাবনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক। হাওরের বুক চিরে নির্মিত এই সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেল কিংবা গাড়িতে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে রোমাঞ্চকর। দুই পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি আর মাঝখানে সরু সড়ক বর্ষার ভ্রমণকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।
ভোর থেকেই নিকলী বেড়িবাঁধ, বালিখলা ও হাসানপুর সেতু ঘাটে পর্যটকদের ভিড় জমতে শুরু করে। সেখান থেকে ট্রলার ও স্পিডবোট ভাড়া করে দর্শনার্থীরা ছুটে যান হাওরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে। ট্রলারের ছাদে বসে গান, শীতল বাতাসের স্পর্শ, আর বিকেলের লাল সূর্যের প্রতিচ্ছবি পানিতে ধারণ করতে ব্যস্ত থাকেন ভ্রমণ প্রেমীরা।
স্থানীয় মাঝিদের ভাষ্য, বছরের অন্য সময়ে যে বিস্তীর্ণ এলাকা ধানক্ষেতে ঢাকা থাকে, বর্ষা এলেই সেটি রূপ নেয় জলরাশির বিশাল ভাণ্ডারে। এই সময়ই হাওরের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে, আর তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভিড় করেন এখানে।
হাওর ভ্রমণের আরেকটি আকর্ষণ স্থানীয় টাটকা মাছের স্বাদ। বোয়াল, চিতল, আইড়, পাবদা, রুই ও কাতলাসহ নানা প্রজাতির মাছ দিয়ে তৈরি খাবার পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে ঘাটসংলগ্ন হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও প্রতিদিন বাড়ছে ক্রেতার উপস্থিতি।
পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি জোরদার করেছে। ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে এবং অতিরিক্ত গতিতে নৌযান চলাচল রোধে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, বর্ষাকেন্দ্রিক এই পর্যটন মৌসুম হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পর্যটকদের আগমনে নৌযান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় সেবাখাত নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তাদের আশা, পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কিশোরগঞ্জের হাওর ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।
হাওরের বুকে ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় কিশোরদের মাছ ধরা, পর্যটকবাহী স্পিডবোটের ছুটে চলা, বিকেলের সোনালি আলোয় জলের ঝিলিক, বাতাসের মৃদু স্পর্শ আর ঢেউয়ের ছন্দ, সব মিলিয়ে বর্ষার কিশোরগঞ্জের হাওর যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
Leave a Reply