
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, স্টাফ রিপোর্টার (কুলিয়ারচর) কিশোরগঞ্জ।।
সেই শিশুকাল থেকেই চোখে কম দেখতেন। বয়স বাড়ছে, চোখের দৃষ্টিশক্তিও কমছে। এখন একদম কাছের একজন মানুষকেও ছায়ার মতো দেখেন। একা একা চলা ফেরা করতে পারেন না। এমন একজন অক্ষম মানুষ আমাদের সমজে সাধারণত কি করেন? সহজ উত্তর, ভিক্ষাবৃত্তি! যা আমরা শহরে-গ্রামে, হাট-বাজারে কিংবা যানবাহনে দেখে থাকি।
কিন্তু সোহাগ তেমনটি করেন না। তিনি গ্রামের একটি বাজারে ছোট্ট একটি টং দোকান ভাড়া নিয়ে পান-সিগারেট, বিস্কিট, চানাচুর, চিপস্ ইত্যাদি বিক্রি করেন। আন্দাজের উপর ভর করে পানের খিলি বানিয়ে তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে। এমনি করে অন্যান্য পণ্যও।
সামান্য পুঁজির এই দোকানের আয়ে কোনোভাবে কষ্টে-সিষ্টে তার ৪ সদস্যের সংসারটি চলে। স্ত্রী নাসিমা আর এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। ভিটে মাটি টুকু ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই সোহাগের। নি:স্ব, রিক্ত সোহাগের চোখের আলোসহ সহায় সম্বলে শূন্যতা থাকলেও, আত্মমর্যাদায় সে পাকাপোক্ত মানুষ। ভিক্ষাবৃত্তি বা মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য চেয়ে বেড়ানোকে তিনি খুবই অসম্মান আর হানিকর কাজ বলে মনে করেন। তাই নিজের শ্রমে অর্জিত যৎসামান্য আয়ে দিনাতিপাত করছেন অনায়াসে।
সোহাগ মিয়া জানান, শিশুকাল থেকেই তার চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে। বয়স যখন ৯ বা ১০ বছর তখন তার মা তাকে নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তারা বলেন, তার এই রোগ (গ্লুকোমা) কখনোই ভালো হবে না। কিছুটা ভালো দেখার জন্য চোখে লেন্স লাগাতে হবে। তখন অনেক কষ্টে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় একটি লেন্স লাগালে কিছুটা আলো ফিরে এসেছিলো একচোখে। কিন্তু ২০/২৫ বছরে লেন্সটির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেটুকুও আর নেই।
কিছুদিন আগে চিকিৎসকের কাছে গেলে আবারও লেন্স এবং পাওয়ারফুল বিশেষ চশমা ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু টাকা ছাড়া তো সেটি সম্ভব নয়। তাই আর যাননি চিকিৎসকের কাছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, একটি প্রতিবন্ধি কার্ড তিনি কিনেছেন মৃত এক ব্যক্তির পরিবারের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা দিয়ে। এর আগে স্থানীয় মেম্বার ও অফিসে অনেক ঘুরেও তিনি একটি কার্ড পাননি।
সোহাগ আরও জানান, দুই/তিন হাজার টাকা পুঁজিতে চলছে তার পানের দোকানটি। টাকা থাকলে পানের পাশাপাশি মুদি-মনোহারির কিছু মালামাল কিনে বিক্রি করলে আরও কিছু রোজগার হতো। কিন্তু তা তো সম্ভব না। তাই এইভাবেই চলছে তার জীবন-সংসার।
সোহাগের স্ত্রী নাসিমা বেগম জানান, অন্ধ জেনেও তার বাবা-মায়ের পছন্দের কারণে তিনি সোহাগকে বিয়ে করেন। তবে সোহাগ তাকে খুব ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন। তিনি জানান, দোকানটিতে কিছু পুঁজি হলে আয়-রোজগার আর কিছু হলে ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে তারা আর একটু ভালোভাবে চলতে পারতেন।
প্রতিবেশী ও স্থানীয়রাও সোহাগের আত্মমর্যাদার এই সংগ্রামকে সম্মান জানিয়ে বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধিদের খুব সহজ পেশা ভিক্ষাবৃত্তি হলেও, সোহাগ এটাকে বেছে নেননি। তিনি সংগ্রাম করে যাচ্ছেন সম্মানের সাথে, মর্যাদার সাথে পরিশ্রম করে রোজগার করে বেঁচে থাকার জন্য। তারা সোহাগের পাশে সহায়তা নিয়ে দাঁড়াতে বিত্তমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জাফরাবাদ গ্রামের অন্ধ সোহাগ মিয়ার আত্মমর্যাদা রক্ষার এ সংগ্রাম আমাদের সমাজে উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করবে বলে দৃঢ় ধারণা এলাকাবাসীর।
Leave a Reply