
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল স্রোতে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর অবশেষে কৃষক সাইফুল ইসলাম (৫৫)এর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে গফরগাঁও উপজেলার হোসেনপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে একটি ড্রেজার মেশিনের পাইপে আটকে থাকা অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।
শুক্রবার, ৭ অগাস্ট সকালে তার মরদেহ খুঁজে পান স্বজনসহ এলাকাবাসী।
নিহত সাইফুল ইসলাম ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের মরিচারচর টানমলামারি গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৫ অগাস্ট) দুপুর আড়াইটার দিকে উচাখিলা ইউনিয়নের বটতলা বালুরঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি নৌকার পাটাতন উদ্ধারে নদীতে নামেন সাইফুল ইসলাম। পাটাতনটি ধরার চেষ্টার সময় তীব্র স্রোতের টানে তিনি পানিতে তলিয়ে যান। এরপর স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি।
খবর পেয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের লিডার জলিলের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ডুবুরি দল বুধবার বিকেলে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে সেদিন সন্ধ্যায় অভিযান স্থগিত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত টানা সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়েও সাইফুল ইসলামের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি উদ্ধার অভিযান শেষ করে ফায়ার সার্ভিস।
তবে সরকারি অভিযান শেষ হলেও থেমে থাকেননি স্বজনরা। শুক্রবার সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল একটি ট্রলার নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে তল্লাশি শুরু করেন। নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে নদীর স্রোতের গতিপথ ধরে ভাটির দিকে অনুসন্ধান চালাতে থাকেন তারা।
একপর্যায়ে গফরগাঁও উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে ব্রিজ সংলগ্ন হোসেনপুর এলাকায় একটি ড্রেজার মেশিনের পাইপে আটকে থাকা একটি মরদেহ দেখতে পান তারা। কাছে গিয়ে সেটি সাইফুল ইসলামের মরদেহ বলে শনাক্ত করেন স্বজনরা। পরে মরদেহটি উদ্ধার করে ট্রলারে করে নদীপথে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়।
সাইফুল ইসলামের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনরা জানান, বহু বছর আগে তার বাবা ইদ্রিস আলীও নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। এবার একই নদী কেড়ে নিল ছেলের জীবনও। এক পরিবারের দুই প্রজন্মকে ব্রহ্মপুত্রের বুকে হারানোর ঘটনায় এলাকায় শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা রাম প্রসাদ পাল বলেন, দুই দিন ধরে ডুবুরি দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পায়নি। ব্রহ্মপুত্রের প্রবল স্রোতের কারণে মরদেহ অনেক দূরে ভেসে গিয়েছিল বলে আমাদের ধারণা ছিল। উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করার সময় আমরা স্বজনদের ট্রলার নিয়ে নদীতে নজরদারি চালিয়ে যেতে এবং ভাটির বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ রাখতে পরামর্শ দিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মরদেহটি পাওয়া গেছে।
তিন দিনের উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা আর নিরন্তর খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে সাইফুল ইসলাম ফিরেছেন নিজের বাড়িতে। তবে জীবিত নয়, নিথর দেহে। পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলেও প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনা রয়ে গেল আজীবনের জন্য।
Leave a Reply