
কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই জটিল হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতভেদ কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে ঐক্যের বার্তা, অন্যদিকে জামায়াত-সমর্থিত ১১ দলীয় জোট শরিকদের কোন্দল এবং এসবের মধ্যেই ক্রমশ একা হয়ে পড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু, সব মিলিয়ে আসনটিতে ভোটের অঙ্ক এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
প্রথম দিকে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মো.মাজহারুল ইসলামের প্রার্থীতা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ ছিল। মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে সভা-সমাবেশ, বক্তব্য ও কর্মসূচিও পালিত হয়। এতে দলের ভেতরে বিভক্তির চিত্র প্রকাশ্যে আসে।
তবে নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি সময়ে এসে সেই বিভাজন অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে। গতকাল (৪ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় জেলা ও দলের স্থানীয় নেতারা এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার বার্তা দেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল ভোটের মাঠে দলের ক্ষতি কমানোর একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আশা করা হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ে সেই ঐক্যের প্রভাবে বিভক্তি কেটে যাবে।
দলীয় ঐক্যের সিন্ধান্তে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই আসনটি ছেড়ে দিলেও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোটের শরিকদের মধ্যে এখনো চুড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। খেলাফতে মজলিস (দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা প্রতীক) এই দুই দলের মধ্যে প্রার্থী ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই কোন্দলের ফলে ইসলামপন্থী ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভোটারদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। কার পক্ষে ভোট দিলে জোটের অবস্থান শক্তিশালী হবে সে প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর পাচ্ছেন না কর্মী সমর্থকরা।
স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম খান চুন্নু এই আসনের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হলেও এবার তিনি বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত। তিনি ২০১৮ সালে বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
নির্বাচনের শুরুতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলামের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে চুন্নুর সমর্থনে বিএনপির জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন।কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আন্দোলনে ফাটল ধরে। কেউ প্রকাশ্যে কেউ নীরবে সরে দাঁড়ান। নির্বাচনের কাছাকাছি এসে চুন্নু কার্যত রাজনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়েছেন। তবুও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও অতীত পরিচিতিকে ভর করে তিনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ভোটের সমীকরণ এখনো অনিশ্চিত। বিএনপির ঘোষিত ঐক্য কতটা বাস্তব রূপ পায়, খেলাফতী দলগুলোর কোন্দল কতটা ভোটে প্রভাব ফেলে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী চুন্নু কতটা ব্যক্তিগত ভোট টানতে পারেন এই তিনটি বিষয়ই ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির পরীক্ষা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও বিভক্তির বাস্তব প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হবে।
Leave a Reply