
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে নৌকা ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২১ ঘণ্টা পর ইমান মিয়া (২৯) নামে এক কৃষি শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে হাওরে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তার স্বজনরা।
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে বেলা ১১টার দিকে উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের নূরপুর হাওর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরে স্বজনরা মরদেহটি শনাক্ত করেন।
নিহত ইমান মিয়া উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের নূরপুর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দিনমজুর হিসেবে অন্যের জমিতে ধান কাটার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তার উপার্জনের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে বুধবার সকালে চারজন শ্রমিক নূরপুর হাওরে ধান কাটতে যান। তারা স্থানীয় কৃষক জাকারিয়ার জমিতে কাজ করছিলেন। সকাল থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই আকাশ কালো হয়ে যায়। শুরু হয় দমকা হাওয়া, ঝড় ও ভারী বৃষ্টি। মুহূর্তেই উত্তাল হয়ে ওঠে হাওরের পানি।
আবহাওয়ার দ্রুত অবনতি হওয়ায় শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে নৌকাযোগে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু পথে হাওরের প্রবল ঢেউ ও বাতাসের তোড়ে তাদের বহনকারী ছোট নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় নৌকায় থাকা অন্য তিন শ্রমিক কোনোভাবে সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও ইমান মিয়া পানির স্রোতে তলিয়ে যান। পরে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন, স্বজন ও এলাকাবাসী উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। পরে খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। কিশোরগঞ্জ থেকে দুইজন ডুবুরিসহ চার সদস্যের একটি দল দিনভর হাওরের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালায়। তবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবশেষে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নূরপুর হাওরের একটি অংশে তার মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল মরদেহ উদ্ধার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে।
স্থানীয়রা জানান, ইমান মিয়া অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। অল্প বয়স থেকেই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন তিনি। প্রতিদিনের শ্রমের আয় দিয়েই চলত পরিবারের ভরণপোষণ। তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটিতে নেমে এসেছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা। বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য মোছা. ওরোনা বলেন, “ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে শ্রমিকরা নৌকায় করে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে প্রবল বাতাসে নৌকাটি ডুবে যায়। অন্যরা বাঁচতে পারলেও ইমান মিয়া নিখোঁজ হন। পরে আজ তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”
কিশোরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, “কিশোরগঞ্জ থেকে দুইজন ডুবুরিসহ চার সদস্যের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে নিখোঁজ শ্রমিককে উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করে। সাধারণত পানিতে নিখোঁজ হওয়ার ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা পর মরদেহ ভেসে ওঠে। অনেক সময় পানির স্রোতে মরদেহ বিভিন্ন স্থানে চলে যায়।”
অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “নিখোঁজ শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
এদিকে হাওরাঞ্চলে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কৃষিকাজে অংশ নেয়া শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি হাওরে শ্রমিকদের চলাচলের জন্য নিরাপদ নৌযান, আবহাওয়া সতর্কতা এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
Leave a Reply