
আদালতের নির্দেশ অমান্য করে এক মুক্তিযোদ্ধার জায়গা দখল করে পাকা রাস্তা নির্মাণ করছে উপজেলা প্রশাসন। ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলায়। আর নেপথ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ এন ও)খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন সক্রিয় বলে মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অভিযোগ।
জানা গেছে, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের সময় খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার গাড়ি ও বাস ভবনের কাড়ি কাড়ি পোড়া টাকার বান্ডিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তাকে নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। তখন তিনি আত্মগোপনে থাকার পর ধামরাই থেকে মিঠামইন উপজেলায় বদলি করা হযন। খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন মিঠামইন উপজেলাতে এসে আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ইচ্ছামত কাজকর্ম করে চলেছেন।
মিঠামই উপজেলার সদর ইউনিয়নের মামুদ আলীর ছেলে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ইউ এনওর আগ্রাসনের শিকার। ফরিদ উদ্দিনের বাবা ৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হন এবং ফরিদ উদ্দিন আহমেদ নিজে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মিঠামইন মৌজার আর এস খতিয়ান নাম্বার৬৯২, দাগ নাম্বার ৮৫৩ ও ৮৫৭, পরিমাণ ৫৫ শতাংশ ভূমি খরিদা সূত্রে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মালিক এবং দেওয়ানী আদালতের ঘোষিত ডিগ্রি ক্রমে দখলদার আছেন। তার ৫৫ শতাংশ ভূমি থেকে ২৪ শতাংশ ভূমি সরকার অধিগ্রহণ করে ওই জায়গাতে উপজেলা অডিটরিয়াম নির্মাণ করা হয়। মিঠামইন উপজেলা নির্বাচন অফিস থেকে উপজেলা পরিষদ হয়ে মৌলভী পাড়া পর্যন্ত একটি পাকা রাস্তা নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু রাস্তার কাজ শুরু করার পূর্বে উপজেলা প্রশাসন জায়গার সীমানা চিহ্নিত করেনি। অথচ মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চলতি বছরের ৬ মে মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে সার্ভেয়ার দিয়ে পরিমাপ করে রাস্তা নির্মাণ কাজ শুরু করার জন্য লিখিতভাবে অনুরোধ করেন। ওই সময় নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন আহমেদের জায়গা মাপঝোক করে তারপর কাজ করার কথা দিলেও তিনি তার কথা রাখেননি। উপজেলা প্রশাসনের কাছে প্রতিকার না পেয়ে ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা এখন দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এ প্রতিবেদককে জানান ৫৫ শতাংশ জায়গার মালিক হয়েছি দেওয়ানী আদালতের ঘোষিত ডিগ্রী মূলেও। এছাড়াও কিশোরগঞ্জের যুগ্ম জেলা জজ ২ নং আদালতে মোকাদ্দমা চলমান আছে। মোকাদ্দমা নাম্বার ৮২/২০১১। এর আগে অন্য মোকাদ্দমায় ২০/৪/২০০৬ ইং সালে সিনিয়র সহকারী জজ শামসুল আলম অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করেন। আদেশে বলা হয় বিবাদি পক্ষ আগামী শুনানী না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ উপজেলা প্রশাসন বাদির ভূমিতে ভাবে প্রবেশ করতে না পারে মর্মে বিবাদিগণের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
গত ২৬ অগাস্ট কিশোরগঞ্জের অনুসন্ধানী সাংবাদিক প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে তখন চোখে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ আহমেদের মালিকানা জায়গার উপর দিয়ে পাকা রাস্তা নির্মাণের বিষয়টি ।
স্থানীয় লোকজন জানান সোনালী ব্যাংকের সামনের রাস্তা থেকে নির্বাচন অফিস ও উপজেলা পরিষদ ঘেঁসে সোজা করে রাস্তা নির্মাণ করা হলে উভয় পক্ষের জন্য ভালো হতো। উপজেলা প্রশাসন কেন মালিকানা জায়গার উপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ কাজ করছেন তা বোধগম্য নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই কাজ শুরু হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা জায়গার উপরে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এই কাজ দ্রুত গতিতে সম্পূর্ণ করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক প্রতিনিধি দল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের কার্যালয়ে গেলে তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। তবে ওই সময় অফিস কর্মচারীরা সাংবাদিকদেরকে বসার কথা বলে নির্বাহী কর্মকর্তাকে খবর দিয়েছিলেন। কিন্তু দুপুরের খাবার শেষ করেও তিনি আর সাংবাদিকদের সামনে আসেননি। আধাঘন্টা অপেক্ষার পর অফিস পিয়ন সাংবাদিকদের কাছে এসে বলেন স্যার এখন অসুস্থ তাই এসিল্যান্ড স্যারের সাথে দেখা করার কথা বলেছেন। পরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা এসিল্যান্ড রুহুল আমিন শরীফ এর মুখোমুখি হলে তিনি বলেন মূলত এ কাজটি ইউ এনওর। এই মুহুর্তে আমার করার কোন কিছু নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ এনও) আমার দপ্তরকে লিখিত ভাবে নির্দেশ প্রদান করলে তারপর সার্ভেয়ার দিয়ে মাপ ঝোক করা হবে। এর আগে না। তিনি আরো বলেন ইউ এন ও স্যারের সাথে আমি এ বিষয়ে কথা বলব মুক্তিযোদ্ধা যেন তিনি তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন। ওই সময় ভুক্তভোগী মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও উপস্থিত ছিলেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন ধামরাইল উপজেলা কর্মরত থাকা অবস্থায় নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত ছিলেন । বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনের উপর তার নির্দেশে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে বহু ছাত্র জনতা গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা ও গেছে ছাত্র-জনতা। ওই সময় ছাত্র জনতার ধাওয়া খেয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন তার বৃদ্ধ পিতা মাতাকে বাসভবনে ফেলে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তবে তার বাসভবন থেকে ছাত্র জনতা পিতা মাতাকে কোলে করে নিরাপদ আশ্রয় স্থলে নিয়ে যান। ওই সময় খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের কাড়ি কাড়ি পোড়া টাকার ভিডিও ফেসবুক, টুইটার ও টিকটক সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে তার বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা প্রশাসক থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন এবং ইউ এনওর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। ঘটনার কিছু দিন পরই খান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন পুরো বিষয়টি ম্যানেজ করে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হয়ে আসেন।
Leave a Reply