1. admin@bdchannel4.com : 𝐁𝐃 𝐂𝐡𝐚𝐧𝐧𝐞𝐥 𝟒 :
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন

হাওরে স্বপ্নভাঙা মৌসুম: অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো, দিশেহারা কৃষক

এম এ জলিল, স্টাফ রিপোর্টার, করিমগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ।। 
  • প্রকাশিত: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ১৭৬ বার পড়া হয়েছে

 

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল—যে অঞ্চলকে কৃষকেরা ‘আল্লাহর দেয়া খাদ্যভাণ্ডার’ বলে মনে করেন—সেই ভাণ্ডারই এবার অতিবৃষ্টিতে উজাড় হওয়ার মুখে। টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বোরো ধান তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের স্বপ্নের যেন সলিল সমাধি হয়েছে। একমাত্র ফসল হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই এখন বাকরুদ্ধ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের। সব ফসল ঘরে উঠলে হাজার কোটি টাকার উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল। তবে বাস্তবতা এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

রবিবার পর্যন্ত জেলায় প্রায় ৬১ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কৃষকেরা বলছেন, একদিকে ধান কাটার যন্ত্র হারভেস্টার পানিতে চলতে পারছে না, অন্যদিকে তীব্র শ্রমিকসংকট। মাঝেমধ্যে শ্রমিক মিললেও মজুরি অনেক বেশি। ফলে সময়মতো ধান কাটা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এরই মধ্যে যেসব কৃষক ধান কেটেছেন, তারাও নতুন সমস্যায় পড়েছেন। টানা বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে ধানের মধ্যেই অঙ্কুরোদ্গম হচ্ছে। এতে ফসলের মান ও বাজারমূল্য—দুই-ই কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ধান কাটার জন্য ৩৯৫টি হারভেস্টার রয়েছে। গত বছর প্রায় ৭০০টি হারভেস্টার কাজ করেছে। জ্বালানির সংকট না থাকলেও বাস্তবে জলাবদ্ধতার কারণে যন্ত্র ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়েছে।

হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে এখন দেখা যাচ্ছে অন্য এক দৃশ্য—নৌকা নিয়ে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন কৃষকেরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সংগ্রাম যেন তাদের শেষ চেষ্টা।

নিকলী উপজেলার পাচরুখী এলাকার কৃষক কফিল উদ্দিন বলেন, “পানির মধ্যে নেমে ধান কাটছি। কিন্তু ভেজা ধান শুকানোর কোনো উপায় নেই। রোদ না উঠলে সব পচে যাবে।”

একই উপজেলার কুর্শা হাওরের কৃষক সেলিম মিয়ার ভাষায়, “একদিকে বজ্রপাত, অন্যদিকে বৃষ্টি—আমাদের সব শেষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটছি। এটাই সারা বছরের ভরসা।”

আরেক কৃষক আব্দুল হেলিম বলেন, অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। “এখন যদি ফসলই না পাই, ঋণ শোধ করব কীভাবে?”

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়েছে, চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি বেড়েছে ৫ সেন্টিমিটার। যদিও এখনো সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে, তবে ভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

এ বছর আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় ১৪৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হলেও প্রয়োজনীয় ২৩ কোটি ২১ লাখ টাকার বিপরীতে বরাদ্দ এসেছে মাত্র ৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সীমিত বরাদ্দে টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন।

নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সামনে আরও বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে প্রায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে এবং প্রায় ৩৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কেটে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

হাওরের প্রায় সব এলাকায় এখন একই চিত্র—কোথাও শেষ মুহূর্তের লড়াই, কোথাও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা পরাজিত কৃষক। খাদ্য উদ্বৃত্ত এই জেলার কৃষকেরা এ বছর নিজেদের গোলা ভরার আশা ছেড়ে দিতে বসেছেন।

কৃষকদের দাবি, সরকার ঘোষিত ন্যায্যমূল্য যেন প্রকৃত উৎপাদকদের কাছে পৌঁছায় এবং দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হয়। তা না হলে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন তারা—যার প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্যনিরাপত্তায়ও।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায়: বাংলাদেশ হোস্টিং