
কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের নরসুন্দা লেকসিটির ‘গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চ’ এখন আর সাধারণ মানুষের বিনোদনের নিরাপদ স্থান নেই। মুক্তমঞ্চের চারপাশ ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক অবৈধ দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ। এর ফলে একদিকে যেমন দর্শনার্থীদের হাঁটাচলা ও বসার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ এবং কিশোর গ্যাংয়ের উপদ্রবে চরম বিপাকে পড়েছেন বেড়াতে আসা সাধারণ মানুষ।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্মল বাতাস ও নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেছে, মুক্তমঞ্চের বসার বেঞ্চ এবং হাঁটার পথগুলোও এখন নানা দোকানপাটের দখলে। খাবার পানি কেনার পাশাপাশি পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে বসার মতো কোনো পরিবেশ আর অবশিষ্ট নেই।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ে কতিপয় ব্যক্তি প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করছে। শুধু তাই নয়, মিটার ছাড়াই অবৈধ উপায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বাল্বপ্রতি দৈনিক ২০ থেকে ৫০ টাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির জন্য অতিরিক্ত ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। এমনকি নতুন দোকান বসাতে এককালীন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হয়। সবমিলিয়ে এই মুক্তমঞ্চকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার অবৈধ বাণিজ্য চলছে।
পরিবেশ দূষণ ও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি:
স্থানীয় বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে দর্শনার্থীর চেয়ে দোকানের সংখ্যা বেশি। হাঁটার কোনো উপায় নেই।” শিক্ষক আকিব শিকদার জানান, দোকানগুলোর বর্জ্য সরাসরি নরসুন্দা নদী ও কলেজ মাঠে ফেলা হচ্ছে, যা এলাকাটিকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। এছাড়া বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে দর্শনার্থীরা প্রায়ই ছিনতাই ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে পিডিবি কিশোরঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুর রউফ দাবি করেন, মুক্তমঞ্চের দোকানগুলোতে দেয়া বিদ্যুৎ সংযোগ বৈধ। তবে স্থাপনা অবৈধ প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান বলেন, “অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিষয়টি জেলা সমন্বয় কমিটির মিটিংয়েও আলোচনা হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিসের কোনো স্বার্থ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম চলছে। মুক্তমঞ্চের বিশৃঙ্খলা রোধে দোকানপাট নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানকল্পে আমরা কাজ করছি।”
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মুক্তমঞ্চের এই স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। এর আগেও এগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছিল। নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পূর্বে ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টিও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধান করা হবে।
Leave a Reply