কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে যোগদান করেই সাংবাদিকদের সাথে বিাদে জড়িয়েছেন ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ। ছবি তুলতে বাধা ও সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে।
এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে একদিন আগের তারিখ (ব্যাকডেট) দিয়ে সাংবাদিকদের সাথে ইউএনও'র পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার একটি নোটিশ জারি করার অভিযোগ এনে ইউএনও’র আয়োজিত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা বয়কট করেছেন কুলিয়ারচরে কর্মরত সাংবাদিকরা।
জানা যায়, সরকারি আদেশে বদলী হয়ে গত রোববার বিকালে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে যোগদান করেন ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন উপজেলার ১নং গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিগণ নতুন ইউএনও-কে তাঁর কার্যালয়ে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে যান। এ সময় ইউএনও কার্যালয়ে স্থানীয় ৬ জন পেশাদার সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। জনপ্রতিনিধির দলটি ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে চাইলে ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ সাংবাদিকদের দেখে এক অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন-কোনো ছবি তোলা যাবে না; ছবি তুললে তিনি জনপ্রতিনিধিদের ফুলের তোড়া গ্রহণ করবেন না। বাধ্য হয়ে উপস্থিত সাংবাদিকরা জনপ্রতিনিধিদের দেয়া ফুলেল শুভেচ্ছার ছবি না তুলে ইউএনও'র কার্যালয় থেকে বের হয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যান।
অপর দিকে যোগদানের দুই দিন পর মঙ্গলবার দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইউএনও-কে ফুলেল শুভেচছা জানানোর বেশ কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তিনি সানন্দে অন্যদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করছেন এবং ক্যামেরাবন্দী হচ্ছেন।
এছাড়াও মঙ্গলবার দুপুরে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া এক সদস্য (যিনি পেশায় একজন সাংবাদিক) জানান, তিনিসহ কমিটির অপর এক সদস্য (তিনিও পেশায় একজন সাংবাদিক) ইউএনও’র কার্যালয়ে থাকাকালীন উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল এন্ড বি.এম কলেজের শিক্ষকরা তাঁদের কলেজের সভাপতি ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে আসেন। সাংবাদিকদের দেখে সেখানেও তিনি ছবি তুলতে নিষেধ করেন। এমনকি পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসন চত্বরে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত উপজেলা প্রশাসন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা ইউএনও-কে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে এলে তাঁদের ক্ষেত্রেও ছবি তোলায় একই নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। উপস্থিত দুইজন সাংবাদিক ইউএনও’র কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার মাত্র এক মিনিটের মাথায় শুভেচ্ছা জানাতে ফুলের তোড়া নিয়ে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইউএনও’র কার্যালয়ে গেলে চিত্র বদলে যায়। তখন কোনো রকম আপত্তি ছাড়াই ইউএনওকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ছবি তোলার সুযোগ দেয়া হয় এবং সেই ছবিগুলো পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে আসে।
সাংবাদিকদের দেখে বার বার ছবি তোলায় অনাকাঙ্ক্ষিত নিষেধাজ্ঞা জারি করায় স্থানীয় সংবাদকর্মীরা চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বেশ কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি তুলতে ইউএনও’র বাধা দেয়ার কারণ কী? একই স্থানে সাংবাদিক উপস্থিত থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি এবং সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পরপরই ছবি তোলার সুযোগ দেয়ার রহস্য কী? সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ছবি তোলার ক্ষেত্রে ইউএনও’র অনীহা কেন? কুলিয়ারচরের স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রতি কি তাঁর কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ রয়েছে, নাকি তাঁদের পূর্ব শত্রু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে?
সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছবি তোলায় বাধা এবং সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পর ছবি তুলতে দেয়ার এই রহস্যজনক আচরণে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, প্রশাসনিক পদে থেকে এমন আচরণ তথ্যের অবাধ প্রবাহ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক।
ঘটনাটি নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর প্রেক্ষিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে তড়িঘড়ি করে সাংবাদিকদের সাথে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার একটি নোটিশ জারি করা হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, সাংবাদিক প্রতিনিধির কারোর সাথে কোন রকম আলোচনা না করেই ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার একটি নোটিশ তৈরি করে নোটিশটির অনুলিপি দেন জেলা প্রশাসক, কিশোরগঞ্জ ও প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় (প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের অবগতির জন্য)।
নোটিশটি সাংবাদিকদের হাতে হাতে না দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তা ওইদিন ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১ টা ০৬ মিনিটের সময় উপজেলা পরিষদের স্টাফ মো. ওবায়দুল্লাহ সুজনের মাধ্যমে তার মোবাইল ফোনের ০১৯২০৩৮৫৭৯৬ নাম্বার থেকে কুলিয়ারচরের সাংবাদিকদের দুইটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট করে। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো ঐ চিঠিতে একদিন আগের অর্থাৎ ‘২৯ সেপ্টেম্বর’ তারিখ (স্মারক নং- ০৫.৪১,৪৮৫৪,০০০,০০,০৪৮.২৫-৬৪২ (২৫)) উল্লেখ করা হয়। পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা সম্পর্কে উপজেলার গুটিকয়েকজন সাংবাদিক অবগত হলেও বেশিরভাগ সাংবাদিকরা তা জানেন না। সভা শুরুর মাত্র আড়াই ঘণ্টা আগে নোটিশ জারি করা এবং চিঠিতে ব্যাকডেটিংয়ের মতো প্রতারণার আশ্রয়ের কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন সাংবাদিকরা।
হাতে সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে নোটিশ পাঠানো এবং আগের দিনের তারিখ ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরির প্রতিবাদে কুলিয়ারচরে কর্মরত সাংবাদিকরা উক্ত পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা বয়কট করেন।
স্থানীয় সংবাদকর্মীদের দাবি, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার অপচেষ্টা উপজেলা প্রশাসনের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশকে ব্যাহত করছে। তাঁরা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত ঘটনার ব্যাখ্যা ও সুরাহা দাবি জানিয়েছেন।