আজ ১ সেপ্টেম্বর । ১৯৭১ সালের এদিনে মিঠামইন উপজেলার ধুবাজোড়া ও তেলিখাই গ্রামে গণহত্যা সংঘঠিত হয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সেপ্টেম্বর মাসে হাওরে চারদিকে বর্ষার থইথই পানি, থমথমে চারপাশ। কিশোরগঞ্জ জেলার তৎকালীন নিকলী থানার ধুবাজোড়া গ্রাম ও তৎকালীন ইটনা থানার তেলিখাই গ্রামে নেমে এসেছিল এক কালরাত-তুল্য বিভীষিকাময় ভোর। স্থানীয় ঘৃণ্য রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দুই গ্রামে চালিয়েছিল নৃশংস গণহত্যা ও তাণ্ডব। প্রাণ হারিয়েছিলেন ২২ জন বীর সন্তান, ছারখার হয়েছিল গ্রামের বসতবাড়ি। তবে দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পার হয়ে গেলেও এই শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণে আজও নেয়া হয়নি কোনো সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ।
ঘনিয়ে আসা আতঙ্ক ও পাক হানাদারদের থাবাঃ
১৯৭১ সালের অগাস্টে মাঝামাঝি সময়ে হাওরাঞ্চলের কুখ্যাত রাজাকার ও আলবদরদের প্রত্যক্ষ আমন্ত্রণে পাকিস্তানি বাহিনী ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলী থানায় ক্যাম্প স্থাপন করে। ধুবাজোড়া গ্রামের হাজি মো. সওদাগর ভূঁইয়ার বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে ক্যাম্প স্থাপন করেছেন—এমন খবর পৌঁছে যায় ইটনার পাক ক্যাম্পে।
১ সেপ্টেম্বর খুব ভোরে কেওয়ারজোর ইউনিয়নের কান্দিপাড়া গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার কমান্ডার কোরবান আলীর নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকার ও পাক হানাদারদের একটি দল বিশাল বহর নিয়ে ধুবাজোড়া গ্রামের দক্ষিণ হাটি ঘেরাও করে। চারদিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা গ্রামে প্রবেশ করে এবং হাজি মো. সওদাগর ভূঁইয়ার বাড়ি, আব্দুল গনি ভূঁইয়ার বাড়ি এবং রউশন ভূঁইয়ার বাড়িতে তাণ্ডব চালায়।
বর্ষাকাল হওয়ায় চারদিকে পানি বন্দি গ্রামের সাধারণ মানুষ পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি। ঘেরাও করে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়। এরপর চলে অমানুষিক নির্যাতন, ঘরবাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। সেখান থেকে বেছে বেছে গ্রামের প্রভাবশালী, শিক্ষিত ও নেতৃত্বস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ইটনা পাক ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেপরোয়া নির্যাতনের পর তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে ভয়রা নামক স্থানে মাটিচাপা দেয়া হয়।
এই অভিযানে মারাত্মকভাবে আহত হন ইদ্রিস আলী ও মজনু ভূঁইয়া।
ধুবাজোড়া গ্রামের বীর ২০ শহিদদের মধ্যে রয়েছেন. শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক: আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া (শিক্ষক), আব্দুল লতিফ ভূঁইয়া (শিক্ষক), সিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া (শিক্ষক), এবং আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া (মিঠামইন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক)।
জনপ্রতিনিধি ও আইনজীবীদের মধ্যে আব্দুল গণি ভূঁইয়া (ইউপি চেয়ারম্যান), রমিজউদ্দিন ভূঁইয়া (ইউপি সচিব), এবং অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন ভূঁইয়া।
ছাত্রনেতা ও তরুণ সমাজদের মধ্যে আবদুর রাশিদ ভূঁইয়া, রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া (রোকন)।
গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের মধ্যে আব্দুল মজিদ ভূঁইয়া, আব্দুর রউফ ভূঁইয়া, জহিরউদ্দিন ভূঁইয়া, আবদুল খালেক ভূঁইয়া, নূর আলী ভূঁইয়া, বুধাই ভূঁইয়া, রমজান ভূঁইয়া, আবু জামাল (জাহের), চান্দু মিয়া এবং সিরাজ মিয়া।
ধুবাজোড়া গ্রামে তাণ্ডব ও হত্যাকাণ্ড শেষ করে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের দলটি রক্ত তৃষ্ণা মেটাতে চলে যায় তেলিখাই গ্রামের মাথার বাড়িতে। সেখান থেকে তারা আরও দুই বিশিষ্ট ব্যক্তি আমির হোসেন ভূঁইয়া এবং মুলক হোসেন ভূঁইয়াকে আটক করে এবং নির্মমভাবে হত্যা করে।
যে ২২ জন শহিদের তাজা রক্তের ওপর ভর করে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ, তাঁদের ত্যাগের মূল্যায়ন হয়নি আজও। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ধুবাজোড়া বা তেলিখাই গ্রামে তাঁদের স্মৃতির স্মরণে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতিফলক বা স্মারক স্তম্ভ। এমনকি স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে সরকারি নথিপত্রে শহিদদের নাম সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপও নেয়া হয়নি। তবে স্থানীয় সাংবাদিক মোক্তার হোসেন গোলাপ তার লেখনীর মাধ্যমে শহিদদের স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্মৃতিচিহ্নহীন এই গ্রামগুলোতে আজ কেবলই স্বজন হারানোর নীরব কান্না। স্থানীয় সচেতন মহল ও শহিদ পরিবারের একটাই দাবি অবিলম্বে ধুবাজোড়া ও তেলিখাই গণহত্যার স্মৃতি বিজড়িত স্থানে সরকারি খরচে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হোক এবং ২২ জন শহিদের নাম জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের উপযুক্ত সম্মান দেয়া হোক।