কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ভক্তিমূলক পরিবেশে পালিত হয়েছে প্রখ্যাত সুফিসাধক, ইসলামী গবেষক, লেখক ও পীরে মোকাম্মেল হযরত মাওলানা শাহ সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমদ আল হোসাইনী চিশতী (রহ.)-এর ১০ম বার্ষিক উরস মোবারক।
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই দিনব্যাপী এই বার্ষিক ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।
উরস উপলক্ষে দিনব্যাপী কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, জিকির-আজকার, ওয়াজ-নসিহত, দোয়া মাহফিল এবং তাবারক বিতরণসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভক্ত, আশেকান ও মুরিদান এই উরসে অংশগ্রহণ করছেন।
আয়োজকরা জানান, হযরত মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমদ আল হোসাইনী চিশতী (রহ.)-এর আদর্শ, দ্বীনি খেদমত এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তাঁরা।
তিনি ১৯৩২ সালের ৮ এপ্রিল অষ্টগ্রাম উপজেলার ঐতিহাসিক হাবিলী নয়কোষা জমিদারবাড়ির সুপ্রসিদ্ধ সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রসিদ্ধ আলেমে দ্বীন ও বুজুর্গ হযরত সৈয়দ আবদুল হেকিম (রহ.)। তিনি আধ্যাত্মিক ও বংশীয় ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের উত্তরসূরি ছিলেন।
প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা পারিবারিক পরিবেশে অর্জনের পর তিনি তারাকান্দী আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করেন। পরে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হযরত সৈয়দ আমীমুল এহসান (রহ.)-এর কাছে হাদিস শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং তাঁর কাছ থেকেই বায়াত ও খেলাফত লাভ করেন।
হযরত কুতুব উদ্দিন আহমদ আল হোসাইনী চিশতী (রহ.) আজীবন অত্যন্ত অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেছেন। শরিয়তের কঠোর অনুসরণের পাশাপাশি তিনি জিকির, মোরাকাবা ও আত্মশুদ্ধিমূলক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তাঁর তাকওয়া, ইবাদত ও আধ্যাত্মিক জীবন সাধারণ মানুষ ও মুরিদদের কাছে অনুকরণীয় হিসেবে বিবেচিত।
শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি অষ্টগ্রাম হোসাইনীয়া আলিম মাদ্রাসায় অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি অষ্টগ্রাম উপজেলা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সভাপতি, ঐতিহাসিক কুতুব মসজিদ ও কুতুবিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
জনকল্যাণে তিনি কবরস্থান, কমিউনিটি ক্লিনিক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের জন্য ভূমি দান করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'পাক পাঞ্জাতন পাঠাগার'-এ বহু দুর্লভ ইসলামী গ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া অষ্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি মসজিদ, ঈদগাহ, খানকা ও হোসাইনী মোকাম প্রতিষ্ঠা করেন।
সাহিত্য ও ইসলামী গবেষণায়ও তিনি অনন্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নিয়ামতে খোদা আহলে বাইতে মোস্তফা, আত্মার খোরাক, প্রদীপ, সত্যের মানদণ্ড ইমাম হোসাইন (আ.) এবং অসায়েফে হোসাইনী। এছাড়া তাঁর অসংখ্য পাণ্ডুলিপি এখনও প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১৬ সালের ৩০ জুলাই প্রায় ৮৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর ৩০ জুলাই তাঁর স্মরণে বার্ষিক উরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।