কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে নিজস্ব ঐতিহ্য ও রীতিনীতির আলোকে পালিত হয়ে আসছে পবিত্র মহররমের শোকানুষ্ঠান। কারবালার মর্মবাণী, সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ এবং হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের আত্মত্যাগের স্মরণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন স্থানীয়ভাবে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
বৃহস্পতিবার, ৯ মহররম দুপুরে এ উপলক্ষে ঐতিহাসিক হাবেলি বাড়ি আল-হোসাইনী দরবার শরীফ থেকে ‘নিশান গাস্ত’ শোকমিছিল বের করা হয়। আগামীকাল ১০ মহররম বৃহৎ তাজিয়া মিছিলের মাধ্যমে মধ্য অষ্টগ্রামের স্থানীয় কারবালা ময়দানে তাজিয়াগুলো স্থাপন করার মধ্য দিয়ে ১০ দিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী শোকানুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটবে।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ভাটির অলী হিসেবে পরিচিত সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রহ.) এর বংশধর ১৮৩৫ সালে সৈয়দ আবদুল করিম আল-হোসাইনী (রহ.), যিনি আলাই মিয়া সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন তিনি অষ্টগ্রামের হাবেলি বাড়িতে এ শোকানুষ্ঠানের সূচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় প্রায় ১৯১ বছর ধরে একই নিয়ম ও ভাবগাম্ভীর্যে মহররম পালিত হয়ে আসছে।
আলাই মিয়া সাহেবের ইন্তেকালের পর তাঁর উত্তরসূরিরা এ ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে আসছেন। পরবর্তীতে মাওলানা সৈয়দ আবদুল হেকীম আল-হোসাইনী (রহ.) এবং বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মাওলানা সৈয়দ কুতুব উদ্দিন আহমেদ আল-হোসাইনী (রহ.) এ আয়োজনের নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে সৈয়দ আহমেদুল কবির প্রিন্সের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় হোসাইনী ভক্তরা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।
এই ঐতিহ্যের প্রভাবে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকাতেও অনুরূপভাবে মহররমের শোকানুষ্ঠান পালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মহররমের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় ১০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি। এ সময় অংশগ্রহণকারীরা রোজা পালন, সাধারণ জীবনযাপন, মাটিতে শয়ন এবং সংযমের মধ্য দিয়ে কারবালার শোক ও ত্যাগের স্মৃতি ধারণ করেন। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর কারবালার ইতিহাস আলোচনা ও জারিগান পরিবেশন করা হয়। দিনের বেলায় তাজিয়া নির্মাণ এবং বিকেলে মাতম ও মার্সিয়া পাঠের আয়োজন চলে। মাগরিবের পর ফাতিহা, তাবাররক বিতরণ ও ইফতারের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শেষ হয়।
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু জানান, মহররমের ৯ ও ১০ তারিখে হোসাইনী ভক্তদের অংশগ্রহণে বিশেষ শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘গাস্ত’ বা ‘চক্কর’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, এ আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতায় স্থানীয় ভক্ত-অনুরাগীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।