কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর মহল্লায় ভৈরবের এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুকে ঘিরে দিন দিন রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। প্রথমে ঘটনাটি কেবলই একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও, ঘটনাস্থলের আলামত, সন্দেহভাজনদের আচরণ ও গতিবিধি এবং নিহত সোহেল রানার সাথে থাকা মোটা অঙ্কের টাকার ব্যাগ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এটি এখন 'পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড' বলে জনমনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়েছে। নিহতের পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ- এটি কোনো সড়ক দুর্ঘটনা নয়, সোহেল রানাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোকে (পিবিআই) দায়িত্ব দিয়েছেন।
নিহত সোহেল রানা (৩৫) ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহচর এলাকার মৃত সিরাজ মিয়ার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে। তিনি ভৈরব পৌর শহরের মুসলিমের মোড় এলাকায় “মোহাম্মদ কেমিক্যাল” নামে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ছিলেন।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৬ মে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে বাজিতপুর থেকে ব্যবসায়িক বকেয়া টাকা আদায় শেষে মোটরসাইকেলযোগে নিজ বাড়ি ভৈরবে ফিরছিলেন সোহেল রানা। এর কিছুক্ষণ পরই কুলিয়ারচর পৌরসভার বড়খারচর মহল্লার কাশ্মিরী আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন সড়কের পাশে তাকে রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। তার থেকে কিছুটা দূরে মোটরসাইকেলটিও পড়ে ছিল। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে- এমন খবর পেয়ে প্রাথমিকভাবে কোনো মামলা-মোকদ্দমা না করেই হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরে যান স্বজনরা। পরদিন ১৭ মে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত ছাড়াই বাদ যোহর স্থানীয় শম্ভুপুর পাক্কার মাথা কবরস্থানে সোহেল রানার দাফন করা হয়।
প্রাথমিকভাবে রটেছিল, সড়কের ওপর দিয়ে নেয়া ড্রেজার পাইপের তৈরি করা উঁচু স্পীডব্রেকারে ধাক্কা খেয়ে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। কিন্তু দাফনের পর ঘটনার বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য ও আলামত সামনে আসতে শুরু করলে পরিবারের সন্দেহ গভীর হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণত উচ্চগতির কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের সামনের অংশ ভেঙে বা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। কিন্তু বড়খারচর গ্রামের ইলিয়াস মিয়ার মুরগির ফার্ম থেকে উদ্ধার হওয়া সোহেল রানার মোটরসাইকেলটি ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত।
এছাড়া লাশ গোসল করানোর সময় স্বজনরা দেখতে পান, সোহেল রানার মাথার পেছনের মধ্যভাগে ভারী কোনো বস্তুর আঘাতের ফলে ফোলা এবং আধা ইঞ্চি পরিমাণ ছিদ্রযুক্ত জখম রয়েছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে গেলে কেবল মাথার পেছনে এমন ক্ষত হওয়া অসম্ভব বলে দাবি স্থানীয়দের।
দুর্ঘটনার স্থান হিসেবে যে ড্রেজার পাইপের স্পীডব্রেকারে কথা বলা হচ্ছিল, গ্রামবাসীর তথ্যানুযায়ী সেই পাইপটি ঘটনার অন্তত এক সপ্তাহ আগেই সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সুযোগই ছিল না।
এছাড়া ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো সোহেল রানার সাথে থাকা টাকার ব্যাগটি নিখোঁজ হওয়া। পরিবারের দাবি, বিভিন্ন স্থান থেকে আদায় করা প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ছিল ওই ব্যাগে। পরবর্তীতে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে ব্যাগের কাটা ফিতার অংশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের ধারণা, পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা ভারী কোনো বস্তু দিয়ে সোহেল রানার মাথার পেছনে আঘাত করে। আঘাতে তিনি মোটরসাইকেলসহ কিছু দূরে ছিটকে পড়লে দুর্বৃত্তরা টাকার ব্যাগ কেটে নিয়ে পালিয়ে যায় এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করে।
এঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে নিহতের বড় ভাই শাহীন আহম্মেদ বাদি হয়ে গত ৩ জুন কিশোরগঞ্জের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলগ্রহণকারী আদালত নং-০২-এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১৬০/২০২৬)।
মামলায় কুলিয়ারচর উপজেলার বড়খারচর গ্রামের ইলিয়াছ (৫০), মজিবুর মিয়া (৪৮), এবং টুটুল মিয়া (৩৫) সহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পেনাল কোডের ৩০২/২০১/৩৪ দঃ বিঃ ধারায় দায়ের করা এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মরদেহ গুমের চেষ্টা, তথ্য গোপন ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাদি তার অভিযোগে উল্লেখ করেন, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে তার ভাইকে হত্যা করে অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং প্রমাণ নষ্ট করতে এটিকে দুর্ঘটনা বলে এলাকায় প্রচার করে।
আদালতের নির্দেশে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন গত ১৩ জুন একটি প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানান, ইতিপূর্বে থানায় এ বিষয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি বা মামলা হয়নি।
ওসি'র প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর গত ১৭ জুন বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফকরুল ইসলাম মামলাটি অধিকতর ও সুক্ষ্ম তদন্তের জন্য পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (পিবিআই) কিশোরগঞ্জ-কে দায়িত্ব প্রদান করেন। একই সাথে মামলার বাদি মৃত সোহেল রানার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন জানান।
এই নৃশংস ও রহস্যময় ঘটনার পর থেকে পুরো কুলিয়ারচর ও ভৈরব এলাকায় তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এটি কেবল কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড- এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত খুনিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার।