কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিবাবাদ ইউনিয়নের বড়ভাগ মধ্যপাড়া এলাকায় এক বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারীকে গভীর রাতে ঘরে ঢুকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে ধর্ষণের চেষ্টা এবং চুরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার, ৩০ মে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মে রাত আনুমানিক রাত সাড়ে ৩টার দিকে বড়ভাগ মধ্যপাড়া এলাকার মৃত ইকবাল হোসেনের ছেলে মো. রনি মিয়া (২৮) এবং তার সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জন পরিকল্পিতভাবে ওই প্রতিবন্ধী নারীর ঘরে প্রবেশ করে। ভুক্তভোগী নারী একজন এতিম ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী। তিনি চাচার বসতঘরের পাশেই এলাকাবাসীর সহায়তায় নির্মিত একটি টিনের ঘরে একা বসবাস করতেন।
পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত রনি মিয়া দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং প্রায়ই ওই নারীর ঘরের আশপাশে ঘোরাফেরা করতেন। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করলে ভুক্তভোগীর পরিবারকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো বলেও দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ঘটনার রাতে অভিযুক্তরা ঘরের জানালার কাঠের ব্যাট খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় সহযোগীরা বাইরে পাহারায় ছিল। পরে রনি মিয়া ঘরে ঢুকে ওই নারীর হাত, পা ও মুখ ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর পরনের কাপড় ছিঁড়ে যায়।
একপর্যায়ে ওই নারী গোঙানির শব্দ করলে আশপাশের লোকজন ও স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয়রা ঘরের দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে অভিযুক্ত রনি মিয়া ঘরে থাকা নগদ ১০ হাজার টাকা, প্রায় তিন ভরি ওজনের রূপার গহনা এবং এক জোড়া রূপার নূপুর নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পালানোর সময় দরজার সামনে থাকা লোকজনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পরে পরিবারের সদস্যরা ঘরে ঢুকে ভুক্তভোগী নারীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে ওই নারী ইশারার মাধ্যমে তার ওপর সংঘটিত নির্যাতনের বর্ণনা দেন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর চাচা মো. মঞ্জু মিয়া বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে প্রধান আসামি হিসেবে রনি মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ২/৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মাতব্বরের কাছে বিচার চাওয়া হলে তারা বিষয়টি মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন। এমনকি ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া মামলা করলে অভিযুক্তের স্বজনরা ভুক্তভোগীর পরিবারকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ভুক্তভোগীর চাচাতো ভাই মোহাম্মদ জাকির বলেন,“আমার চাচাতো বোন একজন বোবা ও প্রতিবন্ধী মানুষ। ঘটনার সময় তার চিৎকার শুনে আমরা ঘুম থেকে উঠে ঘরে গিয়ে দেখি, তার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। তার হাতে আঁচড়ের দাগ ছিল, জামা ছেঁড়া ছিল এবং মাথার চুল এলোমেলো ছিল। নাকের ফুল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং পায়ের নূপুর খুলে নেওয়া হয়েছে। ঘরের টাকা-পয়সাও নিয়ে গেছে। পরে আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে ইশারায় জানায়, পাশের এলাকার রনি নামের এক ব্যক্তি এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত। একাধিকবার সালিশ হলেও আমরা কখনো সুষ্ঠু বিচার পাইনি।
তিনি আরও বলেন,আমার বোন একজন অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষ। মানুষের সাহায্যে তার জীবন চলে। তার কাছে থাকা টাকা, নূপুর, মোবাইল ফোন, টর্চলাইট এমনকি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডও নিয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন ঈদ উপলক্ষে যে কাপড়চোপড় দিয়েছিল, সেগুলোও নিয়ে গেছে। আমরা এ ঘটনার দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, “মেয়েটির মা অনেক আগেই মারা গেছেন। কিছুদিন আগে তার বাবাও মারা যান। বর্তমানে সে খুব অসহায় অবস্থায় জীবনযাপন করছে। এলাকাবাসী যার যা সামর্থ্য আছে, তা দিয়েই তাকে সহযোগিতা করে আসছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি এলাকায় চুরির জন্য কুখ্যাত। এর আগেও তাকে চুরির ঘটনায় ধরে স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। পুলিশও তাকে একাধিকবার আটক করেছে। কিন্তু জেল থেকে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. রনি মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা বলেন, “অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”